১৯ মে ২০২৬, মঙ্গলবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
১৯ মে ২০২৬, মঙ্গলবার, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

বসনিয়া গণহত্যা: লক্ষাধিক মুসলিম নিধনের এক কাল অধ্যায়

নতুন গতি নিউজ ডেস্ক: নব্বইয়ের দশকে সংঘটিত হওয়া এক নির্মম ট্র্যাজেডি। মানবতা ভুলন্ঠিত করা এ গণহত্যার শিকার বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম। মুসলমানদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছিল সার্বরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কখনও এত বড় গণহত্যা ও জাতিগত শুদ্ধি অভিযান পৃথিবী দেখেনি।

৫১ হাজার ১৯৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ৩.৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা বিশিষ্ট বসনিয়া- হার্জেগোভিনা ইউরোপের বলকান উপদ্বীপের একটি মুসলিম রাষ্ট্র।১৯৭১ সাল নাগাদ বসনিয়ায় মুসলমানরা একক বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করত। পরবর্তী দুই দশকে, অসংখ্য সার্ব আর ক্রোয়াট বসনিয়ায় অভিবাসিত হন। এর ফলে ১৯৯১- এর এক আদমশুমারিতে দেখা যায়, বসনিয়ার ৪০ লাখ বাসিন্দার ৪৪ শতাংশ বসনিয়ান, ৩১ শতাংশ সার্ব, আর ১৭ শতাংশ ক্রোয়াট।

১৯৯২ সালের ১ মার্চ যুগোস্লাভিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় বসনিয়া।মে মাস নাগাদ জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় কমিউনিটি বাহ্যত বসনিয়ার স্বাধীনতার স্বীকৃতিও দেয়।  কিন্তু সার্বরা বসনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী বা ইসলামী মনোভাবের বিস্তার- কোনোটাকেই সহ্য করতে পারছিল না।ফলে মুসলমানদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে বসনিয়ায় জাতিগত শুদ্ধি অভিযান(গনহত্যা) শুরু করে তারা।১৯৯২ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া মুসলিম নিধন থামে ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে। ততদিনে সার্ব সৈন্যরা নৃশংসভাবে লক্ষাধিক মুসলিম যুবক, বৃদ্ধ ও বালককে হত্যা করে। বহুসংখ্যক মুসলিম নারীর ইজ্জত হরণ করে। এমনকি বাদ দেয়নি অতিশয় বৃদ্ধা বা ছোট মেয়েদেরও।যুগোস্লাভিয়ার উপর অস্ত্র-নিষেধাজ্ঞার কারণে বসনিয়ানরা আত্মরক্ষার অস্ত্রও পাচ্ছিলো না।নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার আবেদন করলেও জাতিসংঘ তা গ্রাহ্য করেনি।বরং সার্বদের ঘটনায় হস্তক্ষেপ করাকে অনধিকারচর্চা বলে অভিহিত করে।

নানা নাটকের পর মুসলমানদের ভয়াবহ জাতিগত নিধনের এক পর্যায়ে জাতিসংঘ বসনিয়ায় শান্তিরক্ষী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়।একটি বৃহৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের মাত্র ছয়টি স্থানকে বসনিয়ানদের জন্য সেফ জোন হিসেবে নির্ধারণ করে দেয়।সেব্রেনিকা শহরকে সেফ জোন হিসেবে ঘোষণা করলেও সেখানে মোতায়েন করা হয়েছিল মাত্র কয়েকশ ডাচ শান্তিরক্ষী।

সব কিছু সাজানোই ছিল। ফলে কোনও রকম বাঁধা ছাড়াই ডাচ সৈন্যদের একপ্রকার সহায়তায় ১১ জুলাই শহরটি দখলে নিয়ে ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে সার্বরা।লাইনে দাঁড়িয়ে হত্যা করে নিরাপত্তার ঘোষণা দেওয়া ৮ হাজার মুসলিম যুবক ও নাবালেগ ছেলেদের।সেই গণহত্যার প্রমাণ ভিডিওচিত্র ধ্বংস করে সেখানে জাতিসংঘের নিযুক্ত ডাচ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা। এভাবেই গণহত্যার প্রমাণ লোপাট করা হয়।

ধর্ষনের শিকার ৫০ হাজার নারী, শিশুঃ-
বসনিয়ার যুদ্ধে জাতিগত নিধন প্রক্রিয়ায় মুসলিম নারীদের ব্যাপকভাবে গণধর্ষণ করা হয়েছিলওই সংঘাতে ঠিক কত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কেউ জানে না। বসনিয়া হার্সেগোভিনা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী সংখ্যাটা ছিল ৫০ হাজারের মত।ব্যাপক গণধর্ষণ ছিল ওই যুদ্ধের সার্বিক কৌশলের একটা অংশ। ”সেটা ছিল একটা জাতিকে নির্মূল করার কৌশল।”এধরনের নির্যাতন গোটা জীবনকে বদলে দেয়। মাথা তুলে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে যায়।সেই পরিকল্পিত নির্মূল অভিযান আজো বয়ে বেরাচ্ছে অসংখ্য নারী কালের স্বাক্ষী হয়ে।

ছবি ও তথ্য সহায়তা : আল-জাজিরাহ, বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, টাইম ম্যাগাজিন।

আবার দাম বাড়লো পেট্রোল ডিজেলের

নতুন গতি © All rights reserved.| Developed by eTech Builder

বসনিয়া গণহত্যা: লক্ষাধিক মুসলিম নিধনের এক কাল অধ্যায়

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২০, বৃহস্পতিবার

নতুন গতি নিউজ ডেস্ক: নব্বইয়ের দশকে সংঘটিত হওয়া এক নির্মম ট্র্যাজেডি। মানবতা ভুলন্ঠিত করা এ গণহত্যার শিকার বেশিরভাগই ছিলেন মুসলিম। মুসলমানদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছিল সার্বরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কখনও এত বড় গণহত্যা ও জাতিগত শুদ্ধি অভিযান পৃথিবী দেখেনি।

৫১ হাজার ১৯৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ৩.৫ মিলিয়ন জনসংখ্যা বিশিষ্ট বসনিয়া- হার্জেগোভিনা ইউরোপের বলকান উপদ্বীপের একটি মুসলিম রাষ্ট্র।১৯৭১ সাল নাগাদ বসনিয়ায় মুসলমানরা একক বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করত। পরবর্তী দুই দশকে, অসংখ্য সার্ব আর ক্রোয়াট বসনিয়ায় অভিবাসিত হন। এর ফলে ১৯৯১- এর এক আদমশুমারিতে দেখা যায়, বসনিয়ার ৪০ লাখ বাসিন্দার ৪৪ শতাংশ বসনিয়ান, ৩১ শতাংশ সার্ব, আর ১৭ শতাংশ ক্রোয়াট।

১৯৯২ সালের ১ মার্চ যুগোস্লাভিয়ার কাছ থেকে স্বাধীনতা পায় বসনিয়া।মে মাস নাগাদ জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় কমিউনিটি বাহ্যত বসনিয়ার স্বাধীনতার স্বীকৃতিও দেয়।  কিন্তু সার্বরা বসনিয়ার মুসলমানদের মধ্যে জাতীয়তাবাদী বা ইসলামী মনোভাবের বিস্তার- কোনোটাকেই সহ্য করতে পারছিল না।ফলে মুসলমানদের নির্মূল করার উদ্দেশ্যে বসনিয়ায় জাতিগত শুদ্ধি অভিযান(গনহত্যা) শুরু করে তারা।১৯৯২ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া মুসলিম নিধন থামে ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে। ততদিনে সার্ব সৈন্যরা নৃশংসভাবে লক্ষাধিক মুসলিম যুবক, বৃদ্ধ ও বালককে হত্যা করে। বহুসংখ্যক মুসলিম নারীর ইজ্জত হরণ করে। এমনকি বাদ দেয়নি অতিশয় বৃদ্ধা বা ছোট মেয়েদেরও।যুগোস্লাভিয়ার উপর অস্ত্র-নিষেধাজ্ঞার কারণে বসনিয়ানরা আত্মরক্ষার অস্ত্রও পাচ্ছিলো না।নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়ার আবেদন করলেও জাতিসংঘ তা গ্রাহ্য করেনি।বরং সার্বদের ঘটনায় হস্তক্ষেপ করাকে অনধিকারচর্চা বলে অভিহিত করে।

নানা নাটকের পর মুসলমানদের ভয়াবহ জাতিগত নিধনের এক পর্যায়ে জাতিসংঘ বসনিয়ায় শান্তিরক্ষী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়।একটি বৃহৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের মাত্র ছয়টি স্থানকে বসনিয়ানদের জন্য সেফ জোন হিসেবে নির্ধারণ করে দেয়।সেব্রেনিকা শহরকে সেফ জোন হিসেবে ঘোষণা করলেও সেখানে মোতায়েন করা হয়েছিল মাত্র কয়েকশ ডাচ শান্তিরক্ষী।

সব কিছু সাজানোই ছিল। ফলে কোনও রকম বাঁধা ছাড়াই ডাচ সৈন্যদের একপ্রকার সহায়তায় ১১ জুলাই শহরটি দখলে নিয়ে ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে সার্বরা।লাইনে দাঁড়িয়ে হত্যা করে নিরাপত্তার ঘোষণা দেওয়া ৮ হাজার মুসলিম যুবক ও নাবালেগ ছেলেদের।সেই গণহত্যার প্রমাণ ভিডিওচিত্র ধ্বংস করে সেখানে জাতিসংঘের নিযুক্ত ডাচ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা। এভাবেই গণহত্যার প্রমাণ লোপাট করা হয়।

ধর্ষনের শিকার ৫০ হাজার নারী, শিশুঃ-
বসনিয়ার যুদ্ধে জাতিগত নিধন প্রক্রিয়ায় মুসলিম নারীদের ব্যাপকভাবে গণধর্ষণ করা হয়েছিলওই সংঘাতে ঠিক কত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কেউ জানে না। বসনিয়া হার্সেগোভিনা কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী সংখ্যাটা ছিল ৫০ হাজারের মত।ব্যাপক গণধর্ষণ ছিল ওই যুদ্ধের সার্বিক কৌশলের একটা অংশ। ”সেটা ছিল একটা জাতিকে নির্মূল করার কৌশল।”এধরনের নির্যাতন গোটা জীবনকে বদলে দেয়। মাথা তুলে দাঁড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে যায়।সেই পরিকল্পিত নির্মূল অভিযান আজো বয়ে বেরাচ্ছে অসংখ্য নারী কালের স্বাক্ষী হয়ে।

ছবি ও তথ্য সহায়তা : আল-জাজিরাহ, বিবিসি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, টাইম ম্যাগাজিন।