০৬ জুলাই ২০২৬, সোমবার, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩
০৬ জুলাই ২০২৬, সোমবার, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩

নান্দনিক ফুটবল বলতে যা বোঝায়, এই ম্যাচে তা ছিল না

ফিলাডেলফিয়া থেকে দীপক নন্দী: আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে ম্যাচটা জমে উঠবে আশা করেছিলাম। কারণ টাইব্রেকারে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে প্যারাগুয়ে যেভাবে ষোলোতে উঠে এসেছে, তাদের কাছ থেকে সেই খেলাটা চাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু প্যারাগুয়ের কাছ থেকে এদিন সে খেলাটা দেখতে পেলাম না।

শেষ ষোলোর ফ্রান্স–প্যারাগুয়ে ম্যাচটিতে দেখতে পেলাম শুধুই উত্তেজনা। তবে সেটা মাঠে বলের সঙ্গে নয়। একের পর এক কঠিন ট্যাকল, ধাক্কাধাক্কি, তর্কবিতর্ক আর একে অপরের দিকে তেড়ে যাওয়া মিলিয়ে ম্যাচজুড়ে ছড়াল উত্তাপ। আর সেই উত্তপ্ত লড়াইয়ে শেষ হাসি হেসেছে ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপ্পের একমাত্র গোলে প্যারাগুয়েকে ১–০ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে দিদিয়ের দেশমের দল।

ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই প্যারাগুয়ের কৌশল ছিল ‘আগে ক্লোস ডোর’ নীতি। ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটে প্রায় ৯০ শতাংশ সময় বলের দখল ছিল ফ্রান্সের কাছে। কিন্তু এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসরা বারবার আক্রমণে গিয়েও আটকে গেছে পাঁচ ডিফেন্ডারের গড়া প্যারাগুয়ের রক্ষণে। প্রথম ২০ মিনিটে কোনো শটই লক্ষ্যে রাখতে পারেননি এমবাপ্পেরা।

গোছানো ফুটবল না হলে যা হয়। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে ভিন্ন এক ঘটনায় প্রথম বড় উত্তেজনা দেখা দেয়। আন্দ্রেস কুবাসের ট্যাকলে এমবাপ্পে মাটিতে পড়ে গেলে দুই দলের খেলোয়াড়েরা ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েন। রেফারি ইলগিজ তানতাশেভ পরিস্থিতি সামাল দেন সে যাত্রায়।

প্রথমার্ধে গোলমুখে কোনো দলই গোলে শট নিতে পারেনি। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটি মাত্র তৃতীয় ম্যাচ, যেখানে বিরতির আগে কোনো দলই অন-টার্গেট শট নিতে পারেনি।

বিরতির পর আক্রমণের ধারটা আরো বাড়িয়ে দেয় ফ্রান্স। ৫২ মিনিটে গোলকিপার মাইক মাইনিয়ঁর লম্বা পাসে এমবাপ্পে একাই বল নিয়ে ছুটেছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে দারুণ ট্যাকলে প্যারাগুয়েকে বাঁচান হুয়ান কাসেরেস। সেই কর্নার থেকে দ্রুত খেলা শুরু করে দেম্বেলে প্রায় গোল পেয়েই গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর শট লাগে সাইড নেটে। এরপর বারবার গোলের কাছাকাছি যায় ফ্রান্স, তবে প্যারাগুয়ে গোলকিপার অরলান্দো গিলের দক্ষতায় গোল হয়নি।

একের পর এক আক্রমণ সামলে ৬৫ মিনিট পর্যন্ত সমতা ধরে রাখে প্যারাগুয়ে। এরপর মাঠে নামেন বদলি দেজিরে দুয়ে। দারুণ নৈপুণ্যে বক্সে ঢুকে পড়া দুয়েকে পেছন থেকে ফেলে দেন দিয়েগো গোমেজ। রেফারি প্রথমে খেলা চালিয়ে গেলেও ভিএআরের পরামর্শে মনিটর দেখে সিদ্ধান্ত বদলান। পেনাল্টি পায় ফ্রান্স।

৭০ মিনিটে স্পটকিক থেকে কোনো ভুল করেননি কিলিয়ান এমবাপ্পে। শান্ত মাথায় নিচু শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন ফরাসি অধিনায়ক। এটি এবারের বিশ্বকাপে তাঁর ৭টি গোল এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ১৯তম গোল। একই সঙ্গে টানা তিন বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় গোল করার কীর্তিও গড়লেন এই ফরাসি তারকা। এবারের আসরে লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন এমবাপ্পে, আর বিশ্বকাপ ইতিহাসে গোলসংখ্যায় মেসির (২০ গোল) ঠিক পরেই তাঁর অবস্থান।

গোল হজমের পর প্যারাগুয়ে আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ফরাসি রক্ষণে কোনো ফাটল ধরাতে পারেনি। উল্টো শেষ দিকে ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পায় ফ্রান্স। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে দুয়ের পাস থেকে এমবাপ্পের পরপর দুটি শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় আটকে দেন প্যারাগুয়ের গোলকিপার গিল। তাঁর সেই জোড়া সেভ না হলে ব্যবধান আরও বাড়তো।

ফ্রান্সের এই আক্রমণের ফাঁকেই আবারও দুই দলের খেলোয়াড়েরা ম্যাচজুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে হাতাহাতিতে জড়ান। একের পর এক ট্যাকলের শিকারে বিরক্ত হয়ে ৭৭ মিনিটে কাসেরেসকে ফেলে দেন এমবাপ্পে। যোগ করা সময়ে গালারজার কড়া ট্যাকলের শিকার হওয়া ওলিসেও কিছুক্ষণ পর প্যারাগুয়ে ডিফেন্ডারকে পাল্টা ফেলে দেন।

এমনকি ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পরও দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ালে দ্রুত তাঁদের আলাদা করা হয়। পরিস্থিতি সামলাতে ফ্রান্স কোচ দেশমকে ম্যাচের মধ্যেই একাধিকবার দুই দলের খেলোয়াড়দের মাঝে দাঁড়িয়ে গন্ডগোল থামাতে দেখা গেছে। শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পের পেনাল্টি গোলেই জয় নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করল ফ্রান্স। শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ মরক্কো।

সর্বাধিক পাঠিত

শান্তিপুর স্টেট জেনারেল হাসপাতালে ছিল না বিদ্যুৎ সংযোগ

নতুন গতি © All rights reserved.| Developed by eTech Builder

নান্দনিক ফুটবল বলতে যা বোঝায়, এই ম্যাচে তা ছিল না

আপডেট : ৫ জুলাই ২০২৬, রবিবার

ফিলাডেলফিয়া থেকে দীপক নন্দী: আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে ম্যাচটা জমে উঠবে আশা করেছিলাম। কারণ টাইব্রেকারে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে প্যারাগুয়ে যেভাবে ষোলোতে উঠে এসেছে, তাদের কাছ থেকে সেই খেলাটা চাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু প্যারাগুয়ের কাছ থেকে এদিন সে খেলাটা দেখতে পেলাম না।

শেষ ষোলোর ফ্রান্স–প্যারাগুয়ে ম্যাচটিতে দেখতে পেলাম শুধুই উত্তেজনা। তবে সেটা মাঠে বলের সঙ্গে নয়। একের পর এক কঠিন ট্যাকল, ধাক্কাধাক্কি, তর্কবিতর্ক আর একে অপরের দিকে তেড়ে যাওয়া মিলিয়ে ম্যাচজুড়ে ছড়াল উত্তাপ। আর সেই উত্তপ্ত লড়াইয়ে শেষ হাসি হেসেছে ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপ্পের একমাত্র গোলে প্যারাগুয়েকে ১–০ ব্যবধানে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে দিদিয়ের দেশমের দল।

ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই প্যারাগুয়ের কৌশল ছিল ‘আগে ক্লোস ডোর’ নীতি। ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিটে প্রায় ৯০ শতাংশ সময় বলের দখল ছিল ফ্রান্সের কাছে। কিন্তু এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে ও মাইকেল ওলিসরা বারবার আক্রমণে গিয়েও আটকে গেছে পাঁচ ডিফেন্ডারের গড়া প্যারাগুয়ের রক্ষণে। প্রথম ২০ মিনিটে কোনো শটই লক্ষ্যে রাখতে পারেননি এমবাপ্পেরা।

গোছানো ফুটবল না হলে যা হয়। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে ভিন্ন এক ঘটনায় প্রথম বড় উত্তেজনা দেখা দেয়। আন্দ্রেস কুবাসের ট্যাকলে এমবাপ্পে মাটিতে পড়ে গেলে দুই দলের খেলোয়াড়েরা ধাক্কাধাক্কিতে জড়িয়ে পড়েন। রেফারি ইলগিজ তানতাশেভ পরিস্থিতি সামাল দেন সে যাত্রায়।

প্রথমার্ধে গোলমুখে কোনো দলই গোলে শট নিতে পারেনি। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটি মাত্র তৃতীয় ম্যাচ, যেখানে বিরতির আগে কোনো দলই অন-টার্গেট শট নিতে পারেনি।

বিরতির পর আক্রমণের ধারটা আরো বাড়িয়ে দেয় ফ্রান্স। ৫২ মিনিটে গোলকিপার মাইক মাইনিয়ঁর লম্বা পাসে এমবাপ্পে একাই বল নিয়ে ছুটেছিলেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে দারুণ ট্যাকলে প্যারাগুয়েকে বাঁচান হুয়ান কাসেরেস। সেই কর্নার থেকে দ্রুত খেলা শুরু করে দেম্বেলে প্রায় গোল পেয়েই গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর শট লাগে সাইড নেটে। এরপর বারবার গোলের কাছাকাছি যায় ফ্রান্স, তবে প্যারাগুয়ে গোলকিপার অরলান্দো গিলের দক্ষতায় গোল হয়নি।

একের পর এক আক্রমণ সামলে ৬৫ মিনিট পর্যন্ত সমতা ধরে রাখে প্যারাগুয়ে। এরপর মাঠে নামেন বদলি দেজিরে দুয়ে। দারুণ নৈপুণ্যে বক্সে ঢুকে পড়া দুয়েকে পেছন থেকে ফেলে দেন দিয়েগো গোমেজ। রেফারি প্রথমে খেলা চালিয়ে গেলেও ভিএআরের পরামর্শে মনিটর দেখে সিদ্ধান্ত বদলান। পেনাল্টি পায় ফ্রান্স।

৭০ মিনিটে স্পটকিক থেকে কোনো ভুল করেননি কিলিয়ান এমবাপ্পে। শান্ত মাথায় নিচু শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন ফরাসি অধিনায়ক। এটি এবারের বিশ্বকাপে তাঁর ৭টি গোল এবং বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের ১৯তম গোল। একই সঙ্গে টানা তিন বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় গোল করার কীর্তিও গড়লেন এই ফরাসি তারকা। এবারের আসরে লিওনেল মেসির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন এমবাপ্পে, আর বিশ্বকাপ ইতিহাসে গোলসংখ্যায় মেসির (২০ গোল) ঠিক পরেই তাঁর অবস্থান।

গোল হজমের পর প্যারাগুয়ে আক্রমণে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ফরাসি রক্ষণে কোনো ফাটল ধরাতে পারেনি। উল্টো শেষ দিকে ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পায় ফ্রান্স। যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে দুয়ের পাস থেকে এমবাপ্পের পরপর দুটি শট অবিশ্বাস্য দক্ষতায় আটকে দেন প্যারাগুয়ের গোলকিপার গিল। তাঁর সেই জোড়া সেভ না হলে ব্যবধান আরও বাড়তো।

ফ্রান্সের এই আক্রমণের ফাঁকেই আবারও দুই দলের খেলোয়াড়েরা ম্যাচজুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে হাতাহাতিতে জড়ান। একের পর এক ট্যাকলের শিকারে বিরক্ত হয়ে ৭৭ মিনিটে কাসেরেসকে ফেলে দেন এমবাপ্পে। যোগ করা সময়ে গালারজার কড়া ট্যাকলের শিকার হওয়া ওলিসেও কিছুক্ষণ পর প্যারাগুয়ে ডিফেন্ডারকে পাল্টা ফেলে দেন।

এমনকি ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার পরও দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ছড়ালে দ্রুত তাঁদের আলাদা করা হয়। পরিস্থিতি সামলাতে ফ্রান্স কোচ দেশমকে ম্যাচের মধ্যেই একাধিকবার দুই দলের খেলোয়াড়দের মাঝে দাঁড়িয়ে গন্ডগোল থামাতে দেখা গেছে। শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পের পেনাল্টি গোলেই জয় নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করল ফ্রান্স। শেষ আটে তাদের প্রতিপক্ষ মরক্কো।