মোবারক মন্ডল, নতুন গতি, নদীয়া : বর্তমান যুগে মিডিয়া হচ্ছে তথ্য পরিবেশনের এক অন্যতম সুবিশাল ও সুবিস্তীর্ন মাধ্যম। মিডিয়ার মাধ্যমেই আমরা দেশ বিদেশের নানা সংবাদ ঘরে বসে পেয়ে থাকি। সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পত্রিকার পাতায় চোখ বুলানো আমাদের নিত্যদিনের অভ্যাস হয়ে গেছে। তারপর, চায়ের দোকানে সেই সংবাদ নিয়ে চুলচিরা বিশ্লেষণ, তর্ক বিতর্ক করা আমাদের জন্য হয়ে গেছে নিত্যদিনের কাজের এক অপরিহার্য অংশ। প্রকৃতপক্ষে জনগন মিডিয়া কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যকে ঈশ্বরের প্রত্যাদেশের মতই বিশ্বাস করে। যেমন, মানুষ কোন দলিল পেশ করার সময় পত্রিকার দোহায় দিয়ে বলে ” এটা পেপারে দেখেছি, অমুক দিন অমুক পেপারে এটা ছেপেছে”। এ থেকে বুঝা যায় জনগন মিডিয়ার তথ্যকে কতটা বিশ্বাস করে, মিডিয়ার প্রতি মানুষের কত আস্থা। কিন্তু, আজকে মিডিয়া তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। ফলতঃ তাদের পক্ষপাতিত্ব সংবাদ দেশ দেশান্তরে দ্বন্দ্ব, কলহ, সন্ত্রাস, বিবাদ সৃষ্টি করছে নিরীহ জনগণের মাঝে।
মিডিয়া সন্ত্রাস কি ?
মিডিয়া সন্ত্রাস হল মিথ্যা তথ্যের দ্বারা জনগণকে বিভ্রান্ত করে সন্ত্রাস সৃষ্টি বা সন্ত্রাসের প্রতি উস্কানি দেওয়া। কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে বা অন্য যে কোনো হীন স্বার্থে মিথ্যা, বানোয়াট, অতিরঞ্জিত ও উদ্দেশ্যমূলক তথ্য পরিবেশনকেই মিডিয়া সন্ত্রাস বলে। প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে হিংসা, বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছড়িয়ে, শ্রেণী সম্প্রদায় বা জাতিগত হানাহানি ও রক্তক্ষম সৃষ্টির মাধ্যমে ধর্মীয় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করাই হল মিডিয়া সন্ত্রাসের উদ্দেশ্য।
বিশেষ করে সংবাদপত্র এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে এ সন্ত্রাস ছড়ানো হয়। কিন্তু বর্তমানে মিডিয়া ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিও পিছিয়ে নেই। যেমন, ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি। একটা সময় পেপার পত্রিকা একটা শ্রেনীর মানুষ পড়ত। এখন ইন্টারনেটের যুগে ছোট থেকে বড়, শিক্ষিত, অশিক্ষিত তথা সকল শ্রেণির মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে চোখ রাখে। প্রযুক্তির যুগে ছবি বা ভিডিও এডিটিং করে উদ্দশ্যমুলকভাবে কোনো এক তথ্যকে প্রচার করা হয় যা মূহুর্তের মধ্যে দেশ বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় বিশ্ব জুড়ে সমালোচনা।
এছাড়াও পুস্তক-পুস্তিকা, লিফলেট-পোস্টার, ভাষণ-বিবৃতি, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, এনজিও এবং চলচ্চিত্রে প্রদর্শিত গল্প, নাটক, সিনেমা ইত্যাদির মাধ্যমেও তা ছড়াচ্ছে সংক্রামক ব্যাধির মতোই। মিডিয়া সন্ত্রাস ও ইয়েলো জার্নালিজম বা হলুদ মিডিয়া প্রায় একে অপরের সমার্থক।
বর্তমান বিশ্বে এই ‘মিডিয়া সন্ত্রাস’ জনগণ ও সমাজের হিতের পরিবর্তে মারাত্মক বিপদজনক হয়ে উঠছে দেশ ও জাতির জন্য। যা অল্প সময়ের মধ্যে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। সামান্য কিছু ঘটনা ঘটেছে বা আদৌ কিছুই ঘটেনি এমন সব কুয়াশাচ্ছন্ন তথ্য গুলোকে তিলকে তাল করে প্রচার করা হচ্ছে এই মিডিয়ায়। সত্য কে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য করে চায়ের কাপে ঝড় সৃষ্টি করে থাকে এই মিডিয়া সন্ত্রাসীরা। নয় কে ছয় আর ছয়কে নয় করাই হলো মিডিয়া সন্ত্রাসীদের কাজ। জিরো কে হিরো বানাতে আর হিরোকে জিরো বানাতে এদের জুড়ি মেলা ভার। কোন ব্যক্তি বা সংস্থাকে রাতারাতি জনগণের নজরে নিয়ে আসতে পারে এই মিডিয়া।
এই মিডিয়া সন্ত্রাসের ফলে কত নিরীহ নিরাপরাধ মানুষ মান মর্যদা হারিয়ে নিভৃতে কাঁদে, তাদের খবর কে রাখে? সন্ত্রাসী মিডিয়ার অনধিকার চর্চায় আজকের প্রজন্ম নিজ অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে, কে দেবে তার হিসাব? সন্ত্রাসীরা তো কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উপর আক্রমণ করে কিন্তু মিডিয়া সন্ত্রাসীরা সমস্ত মানুষের মগজ ধোলাই করে মানুষের সুস্থ চিন্তাশক্তিকে ছিনিয়ে নিয়ে অশুদ্ধ চিন্তাভাবনার দিকে ধাবিত করে। যা সন্ত্রসের থেকেও ভয়াবহ।
সবচেয়ে লজ্জার ব্যাপার হল মিডিয়াগুলি কোন না কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক। রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে। প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্র পত্রিকা ও নিউজ চ্যানেলগুলি এক একটা রাজনৈতিক দলের হয়ে প্রচার চালায় এবং ভোট ব্যঙ্ক তৈরি করে। ক্ষমতাসীন দলগুলির ক্ষমতা অর্জনের পিছনে গদি মিডিয়াগুলি বৃহৎ ভূমিকা পালন করে। রাতদিন সমর্থক দলের হয়ে ভুয়ো, মিথ্যা, বানোয়াট তথ্য পরিবেশন করে এবং প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে কৌশল তৈরি করে।
ফলে মানুষও আজকাল মিডিয়াগুলির উপর আস্থা হারিয়ে যে যে দলের সমর্থক সে সেই দলের পত্রিকা বা নিউজ দেখে। কারণ মানুষ জেনে গেছে এরা হচ্ছে রাজনৈতিক দলের দালাল। তাদের কাছে নিরপেক্ষ সংবাদ আশা করা বাতুলতা মাত্র।
মিডিয়াকে বলা হয়ে থাকে সমাজের তথা গোটা বিশ্বের দর্পণ। যাতে ভেসে উঠে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার প্রতিবিম্ব। মিডিয়া আধুনিক সভ্য জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ।
যার মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন তথ্য বা সংবাদ জানতে পারি । জনগণের মনের কথা, দেশ বিদেশের ঘটনা, নেতা নেত্রীদের দূর্নীতি, দেশের উন্নয়ন, ইত্যাদি নিরপেক্ষভাবে প্রকাশ করাই মিডিয়ার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আর প্রতিটি মিডিয়াই দাবী করে তারা নিরপেক্ষভাবে, নির্ভীকভাবে সংবাদ উপস্থাপন করে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি ভিন্ন চিত্র।
সভ্যতার ক্রমবিকাশের সূত্র ধরে মানবজীবনে যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচনার উল্লেখযোগ্য উপকরণ হিসেবে সংবাদপত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মিডিয়ার পরিধি কেবল সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। জ্ঞানচর্চা, জনমত গঠন, রাজনীতি ও সরকার ব্যবস্থায়ও সংবাদপত্রের রয়েছে ইতিবাচক ভূমিকা।
স্বাভাবিকভাবে মিডিয়ার কাজ হল কোন ঘটনার সাথে জড়িত পক্ষদেরকে নিয়েই নিরপেক্ষভাবে তথ্য উপস্থাপন করে প্রকৃত সংকট সমাধানের পথ দেখানো। তাই এটাকে অনেকে তৃতীয় শক্তি ও রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে মনে করেন। আধুনিক যুগে মিডিয়া হল সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। ‘অসির চেয়ে মসির শক্তি বেশি ‘ মিডিয়া তার বাস্তব উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মিডিয়া অনেক কিছু করতে পারে। মিডিয়া জানায়, শেখায়, সচেতন করে, বিনোদিত করে।অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করে একত্রিত করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাস্তবে তা কতটা সাফল্যের সঙ্গে করে?
এই মিডিয়াই যখন নিরপেক্ষতার নামে কারো পক্ষাবলম্বন করে তথ্য উপস্থাপন করে তখন এক পক্ষ ঠিকই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। যার ফলে আরেকপক্ষ দাম্ভিক আচরণ করতে থাকে, একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখে। এই ভাবেই সমাজ,রাষ্ট্রে ও বিশ্বে সংকট ঘনীভূত হয়। কোন হত্যাকান্ড হলেই এই মিডিয়া গুলো তাদের নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোনের নামে প্রশাসনের তথ্য ছাড়াই কোন এক রাজনৈতিক দলের লোক বলে প্রচার শুরু করে এবং সাথে সাথেই হত্যাকারী ব্যক্তি কোন দলের, তা তারাই ঠিক করে দেয়। আদৌ দেখা যায় সে কোন দলই করে না। ফলে এক পার্টির টিআরপি বাড়ে অপর পার্টির টিআরপি নেমে যায়। অথবা কোন জায়গায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সংঘটিত হলে মিডিয়া সর্বাগ্রে সেটা চাপিয়ে দেয় পূর্ব থেকে নির্ধারণ করা একটা জাতির উপর। এবং সেই সংবাদকে বারবার পরিবেশন করে মানুষের মনে তা সত্যরুপে গেঁথে দেওয়া হয়। আর মানুষও তা গ্রোগাসে গিলে।
তবে মিডিয়ার এই পক্ষপাতমূলক আচরণ শুধূ দেশেই নয় আন্তর্জাতিকভাবেও ঘটে। আজকে যদি আমরা বিশ্ব মিডিয়ার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে, সিএনএন, বিবিসি ও রয়টার্সের মতো বিশ্বমিডিয়াও পক্ষপাতিত্বমূলক তথ্য উপস্থাপন করে, সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা করে। একটা দেশ ও জাতিকে কোনঠাসা করে।
দেশ ও জাতিকে সঠিক পথে উন্নত ও সমৃদ্ধ করার জন্য ‘নিরপেক্ষতা’ হল সাংবাদিকতার অন্যতম হাতিয়ার। একজন সাংবাদিক কখনো কোন রাজনৈতিক দলের কাছে বিক্রি হতে পারেন না। নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশেন করাই হবে তার লক্ষ্য ও মহান বৈশিষ্ট্য । একমাত্র তারাই পারে দূর্নিতীবাজদের মুখোশ উন্মোচন করতে। তারাই পারে দেশের উন্নয়ন করতে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে। তাদের দ্বারাই সম্ভব নব প্রজন্মকে সঠিক দিশা দেখাতে। আর দশটা পেশার থেকে এই পেশাটা ভিন্ন। তারা বিক্রি হয়ে গেলে শাসকদল দেশকেও বিক্রি করে দিবে। দেশের উন্নয়ন হবে না।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে এই পক্ষপাতিত্ব বেশিদিন স্থায়ী হবে না। কারণ সাধারণ মানুষ বোকা নয়, তেমনি মেশিন ও নয় যে, যা বলা হবে তাই মেনে নেওয়া হবে বা সেদিকেই জনগণ এগোবেন। আর এটাও মাথায় রাখা দরকার যে, সাধারণ মানুষের নিজ নিজ মতাদর্শ আছে বলেই নিজ নিজ মতাদর্শের খবরকে বেশি গুরুত্ব দেন।
তাই আমরা চাই দেশের জাতীয় স্বার্থে সকলের মনের কথাগুলো মিডিয়ার মাধ্যমে প্রকাশিত হোক।জাতিকে বিচ্ছিন্ন করতে নয়,কোন ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠিকে হেয় বা সুবিধা দেয়ার জন্য নয়,সুস্থ সুন্দর দেশ গড়তে ও দেশপ্রেম জাগ্রত করে সমগ্র ভারতের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করাই হোক মিডিয়ার লক্ষ্য।দেশপ্রেম,সততা ও নিরপেক্ষতাই হবে যাদের একমাত্র পাথেয়।
নতুন গতি 























