২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

বন্ধ পাঠশালা, মুখ শুকনো কাঞ্চনদের

  • নতুন গতি
  • আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার
  • 10

পুরুলিয়া: টানা আড়াই বছর ধরে বন্ধ বিলুপ্তপ্রায় বিরহোড় প্রজাতির শিশুদের সকালের পাঠশালা। যে পাঠশালা ছিল ওদের শিক্ষার আলোর অঙ্গনে নিয়ে আসার আলপথ, তার ঝাঁপ বন্ধ হওয়ায় আলপথ ঢেকেছে অন্ধকারে। বিরহোড়রা তো বটেই, বিলুপ্তপ্রায় এই প্রজাতিকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা গবেষণা করছেন, তাঁরাও চাইছেন, ফের চালু হোক এই পাঠশালা।

বাঘমুন্ডি ব্লকের ভূপতিপল্লিতে ২০১৯-এ প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হয় সকালের পাঠশালা। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রোজের পঠনপাঠন শুরু হওয়ার আগে সকাল সাতটা থেকে ন’টা পর্যন্ত ঘণ্টা দুয়েক চলত শিক্ষাকেন্দ্র। শিশুদের পড়ানোর দায়িত্ব বর্তায় বিরহোড় প্রজাতির সেই সময়ের দুই তরুণ কাঞ্চন শিকারি ও সীতারাম শিকারির উপরে, যাঁরা তত দিনে উচ্চ মাধ্যমিকের সীমা পেরিয়ে গিয়েছেন। রুবি বন্দ্যোপাধ্যায় নামে বাঘমুন্ডির এক শিক্ষিকাও ছিলেন। তাঁরা জানালেন, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়ারা পাঠশালায় পড়াশোনা করত। দশটা থেকে স্কুলে ক্লাস। কিন্তু ২০২৩-এ আচমকা এর ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায় একদিন।

কাঞ্চনের কথায়, ‘ব্লক প্রশাসন থেকে পড়ানোর জন্য মাসে পাঁচ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। ২০২৩-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঠশালা চালিয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, ডিসেম্বরের অনেক আগে পাঠশালা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই বছরের অগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পারিশ্রমিকও পাইনি।’ তিনি আরও বললেন, ‘গাঁয়ের মানুষ জিজ্ঞাসা করেন, ছেলেমেয়েগুলো পড়ছিল, তা বন্ধ হলো কেন? এর উত্তর তো জানা নেই!’

চলতি বছরে বিরহোড় প্রজাতির পাঁচ পড়ুয়া মাধ্যমিক পাশ করেছে। এর আগে কোনও এক বছরে বিরহোড়দের ঘরের এত জনের একসঙ্গে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হওয়ার নজির নেই। এলাকার যে হাইস্কুলে বিরহোড় পড়ুয়াদের সিংহভাগ ভর্তি হয়, সেই পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু আদর্শ আবাসিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সৌরভ দত্ত বললেন, ‘সকালের শিক্ষাকেন্দ্রটি বিরহোড়দের উপকারে লাগত।’

এ বার মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ভারতী শিকারি ও লক্ষ্মীমণি শিকারি বলছে, ‘আমাদের গ্রামে স্কুলের আগে সকালে দু’ঘন্টা যে আলাদা ক্লাস হতো, সেখান থেকে অনেকে উপকৃত হয়েছে। এখন বন্ধ।’ বিরহোড় প্রজাতিকে নিয়ে গবেষণা করা পেশায় শিক্ষক জলধর কর্মকার বললেন, ‘এ বার একসঙ্গে বিরহোড়দের পাঁচ জন মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়েছে, তাতে এর ভূমিকা রয়েছে। নতুন সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে পাঠশালা খোলার।’

বাঘমুন্ডি ব্লক প্রশাসন সূত্রে খবর, এই শিক্ষাকেন্দ্র চালাতে সরকারি তহবিল থেকে যে অর্থ আসত, তা বন্ধ হওয়ায় শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ করতে হয়। জেলা অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তর সূত্রের খবর, এ নিয়ে রাজ্যস্তরে চিঠি পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি। বাঘমুন্ডির বিধায়ক রহিদাস মাহাতো বললেন, ‘বিষয়টি জানতাম না। খোঁজ নিয়ে দেখছি।’ রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী নদিয়ারচাঁদ বাউরি বলেছেন, ‘বাধা কাটিয়ে কী ভাবে এই কেন্দ্রটি ফের চালু করা যায়, দেখা হবে।’

 

বন্ধ পাঠশালা, মুখ শুকনো কাঞ্চনদের

নতুন গতি © All rights reserved.| Developed by eTech Builder

বন্ধ পাঠশালা, মুখ শুকনো কাঞ্চনদের

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, মঙ্গলবার

পুরুলিয়া: টানা আড়াই বছর ধরে বন্ধ বিলুপ্তপ্রায় বিরহোড় প্রজাতির শিশুদের সকালের পাঠশালা। যে পাঠশালা ছিল ওদের শিক্ষার আলোর অঙ্গনে নিয়ে আসার আলপথ, তার ঝাঁপ বন্ধ হওয়ায় আলপথ ঢেকেছে অন্ধকারে। বিরহোড়রা তো বটেই, বিলুপ্তপ্রায় এই প্রজাতিকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা গবেষণা করছেন, তাঁরাও চাইছেন, ফের চালু হোক এই পাঠশালা।

বাঘমুন্ডি ব্লকের ভূপতিপল্লিতে ২০১৯-এ প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হয় সকালের পাঠশালা। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রোজের পঠনপাঠন শুরু হওয়ার আগে সকাল সাতটা থেকে ন’টা পর্যন্ত ঘণ্টা দুয়েক চলত শিক্ষাকেন্দ্র। শিশুদের পড়ানোর দায়িত্ব বর্তায় বিরহোড় প্রজাতির সেই সময়ের দুই তরুণ কাঞ্চন শিকারি ও সীতারাম শিকারির উপরে, যাঁরা তত দিনে উচ্চ মাধ্যমিকের সীমা পেরিয়ে গিয়েছেন। রুবি বন্দ্যোপাধ্যায় নামে বাঘমুন্ডির এক শিক্ষিকাও ছিলেন। তাঁরা জানালেন, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ুয়ারা পাঠশালায় পড়াশোনা করত। দশটা থেকে স্কুলে ক্লাস। কিন্তু ২০২৩-এ আচমকা এর ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যায় একদিন।

কাঞ্চনের কথায়, ‘ব্লক প্রশাসন থেকে পড়ানোর জন্য মাসে পাঁচ হাজার টাকা পারিশ্রমিক দেওয়া হতো। ২০২৩-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঠশালা চালিয়েছিলাম। পরে জানতে পারি, ডিসেম্বরের অনেক আগে পাঠশালা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওই বছরের অগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পারিশ্রমিকও পাইনি।’ তিনি আরও বললেন, ‘গাঁয়ের মানুষ জিজ্ঞাসা করেন, ছেলেমেয়েগুলো পড়ছিল, তা বন্ধ হলো কেন? এর উত্তর তো জানা নেই!’

চলতি বছরে বিরহোড় প্রজাতির পাঁচ পড়ুয়া মাধ্যমিক পাশ করেছে। এর আগে কোনও এক বছরে বিরহোড়দের ঘরের এত জনের একসঙ্গে মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হওয়ার নজির নেই। এলাকার যে হাইস্কুলে বিরহোড় পড়ুয়াদের সিংহভাগ ভর্তি হয়, সেই পণ্ডিত রঘুনাথ মুর্মু আদর্শ আবাসিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সৌরভ দত্ত বললেন, ‘সকালের শিক্ষাকেন্দ্রটি বিরহোড়দের উপকারে লাগত।’

এ বার মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ভারতী শিকারি ও লক্ষ্মীমণি শিকারি বলছে, ‘আমাদের গ্রামে স্কুলের আগে সকালে দু’ঘন্টা যে আলাদা ক্লাস হতো, সেখান থেকে অনেকে উপকৃত হয়েছে। এখন বন্ধ।’ বিরহোড় প্রজাতিকে নিয়ে গবেষণা করা পেশায় শিক্ষক জলধর কর্মকার বললেন, ‘এ বার একসঙ্গে বিরহোড়দের পাঁচ জন মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হয়েছে, তাতে এর ভূমিকা রয়েছে। নতুন সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে পাঠশালা খোলার।’

বাঘমুন্ডি ব্লক প্রশাসন সূত্রে খবর, এই শিক্ষাকেন্দ্র চালাতে সরকারি তহবিল থেকে যে অর্থ আসত, তা বন্ধ হওয়ায় শিক্ষাকেন্দ্র বন্ধ করতে হয়। জেলা অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তর সূত্রের খবর, এ নিয়ে রাজ্যস্তরে চিঠি পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি। বাঘমুন্ডির বিধায়ক রহিদাস মাহাতো বললেন, ‘বিষয়টি জানতাম না। খোঁজ নিয়ে দেখছি।’ রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী নদিয়ারচাঁদ বাউরি বলেছেন, ‘বাধা কাটিয়ে কী ভাবে এই কেন্দ্রটি ফের চালু করা যায়, দেখা হবে।’