ইমামা খাতুন: আকস্মিক হড়পা বান, পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফ, পাথর ও কাদার প্রবল স্রোতে কার্যত বিপর্যস্ত নেপাল। একের পর এক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি এবং নিখোঁজের ঘটনায় ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। এরই মধ্যে মৃত্যুর মুখ থেকে অলৌকিকভাবে ফিরে দেশে পৌঁছলেন তামিলনাড়ুর ২১ জন তীর্থযাত্রী। শুক্রবার চেন্নাই বিমানবন্দরে তাঁদের নামার পর প্রকাশ্যে আসে নেপালের সেই ভয়াবহ দুর্যোগের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে, দুর্যোগের আগে সময়োপযোগী সতর্কবার্তা না দেওয়ার অভিযোগ তুলে চিনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন নেপালের প্রাক্তন বন ও পরিবেশমন্ত্রী মাধব প্রসাদ চৌলাগাইন। যদিও সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছে কাঠমান্ডুতে অবস্থিত চিনা দূতাবাস।
তামিলনাড়ুর ওই ২১ তীর্থযাত্রী নেপাল-তিব্বত সীমান্তের জিরং বন্দরে একটি পর্যটক কনভয়ের অংশ ছিলেন। পর পর দাঁড়িয়ে থাকা বাসগুলিতে তখন অপেক্ষা করছিলেন তাঁরা। আচমকাই পাহাড়ের দিক থেকে ভেসে আসে বিকট শব্দ। মুহূর্তের মধ্যে বরফ, পাথর, কাদা ও জলের বিশাল স্রোত আছড়ে পড়ে বাসগুলির উপর। কনভয়ের সামনের দু’টি বাস সেই প্রবল স্রোতে ভেসে যায়। মাঝখানে থাকা বাসটিই কোনওক্রমে রক্ষা পায়।
চেন্নাই বিমানবন্দরে ফিরে বিজয়ভুবনেশ্বরী নামে এক তীর্থযাত্রী জানান, প্রথমে তাঁরা বুঝতেই পারেননি কী ঘটছে। তাঁর কথায়, বোমা বিস্ফোরণের মতো বিকট শব্দের পরেই পাহাড় থেকে প্রবল কাদা-পাথরের জল নেমে আসে। চোখের সামনে কনভয়ের দু’টি বাস হারিয়ে যেতে দেখে বাসের ভিতরে থাকা যাত্রীরা কার্যত ধরে নিয়েছিলেন, তাঁদের আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই।
পরিস্থিতি বুঝে প্রাণ বাঁচাতে বাস থেকে বেরিয়ে উঁচু জায়গার দিকে ওঠার চেষ্টা করেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের উপরে থাকা একটি সশস্ত্র পুলিশ শিবিরে পৌঁছন তীর্থযাত্রীরা। সেখানকার নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যান। এই ঘটনাকে কার্যত ‘দ্বিতীয় জীবন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ওই যাত্রীরা।
দুর্যোগের ভয়াবহতা নিয়ে মুখ খুলেছেন আর এক তীর্থযাত্রী কিরুবাথারিও। তাঁর দাবি, এই ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব বিপদকে আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। তাঁর বক্তব্য, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবের সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকেই।
এদিকে নেপালের ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে চিনের ভূমিকা ঘিরে। নেপালের প্রাক্তন বন ও পরিবেশমন্ত্রী মাধব প্রসাদ চৌলাগাইন অভিযোগ করেছেন, হড়পা বান আছড়ে পড়ার আগে চিনের কাছ থেকে নেপাল কোনও সময়োপযোগী সতর্কবার্তা পায়নি। তাঁর দাবি, বুধবার সকাল ৮টা ৪০ মিনিট নাগাদ নেপাল-তিব্বত সীমান্ত দিয়ে বরফ, পাথর ও কাদার বিপুল স্রোত নেমে আসার আগে প্রয়োজনীয় তথ্য নেপালকে জানানো হয়নি। তাঁর মতে, দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের ঘাটতি মানবিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
চৌলাগাইনের দাবি, ২০২৫ সালে হিমবাহ-সংক্রান্ত একটি ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা প্রোটোকল তৈরি হলেও এবারের দুর্যোগে সেটি কার্যকর করা হয়নি। তিনি আরও দাবি করেন, ঘটনাটির সূত্রপাত নেপালের বদলে তিব্বত এলাকায় হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, দুর্যোগের তথ্য গোপন করা মানবতার পরিপন্থী।
তবে নেপালের এই অভিযোগ সরাসরি খারিজ করেছে চিনা দূতাবাস। তাদের বক্তব্য, চিনা বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করেছেন এবং নেপালের সঙ্গে প্রয়োজনীয় তথ্য বিনিময়ও করা হয়েছে। দুর্গম হিমালয় অঞ্চলে ৪,০০০ থেকে ৫,০০০ মিটার বা তারও বেশি উচ্চতায় অসংখ্য হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ এবং বিশাল বরফ ও পাথরের স্তূপ রয়েছে। অত্যন্ত দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে সেখানে সর্বত্র নিখুঁত পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা পরিচালনা করা আন্তর্জাতিক স্তরেই বড় চ্যালেঞ্জ বলে দাবি করেছে বেজিং।
চিনা দূতাবাস আরও জানিয়েছে, আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপাল ও চিনের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। ২৬ আগস্ট চিনের আবহাওয়া প্রশাসন নেপালের জলবিজ্ঞান ও আবহাওয়াবিজ্ঞান বিভাগের সঙ্গে জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠকও করে। জল-আবহাওয়াবিষয়ক তথ্য এবং ‘ব্যারিয়ার লেক’-সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ তথ্য নিয়মিত বিনিময় করা হয় বলেও দাবি করেছে চিন।
এরই মধ্যে নেপালে উদ্ধার ও ত্রাণ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। শনিবারের হিসাব অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৬ হয়েছে। প্রায় ২,৫০০ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখনও ২,৪০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ বলে জানা গিয়েছে। উদ্ধার অভিযানে ৫,০০০-এর বেশি নেপালি সেনা-সহ মোট ১১,০০০-এরও বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
তামিলনাড়ু সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, রাজ্য থেকে প্রায় ৪০০ জন নেপালে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৪০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে এবং তাঁরা নিরাপদে রয়েছেন। এখনও কমপক্ষে ৮০ জনের কোনও সন্ধান মেলেনি বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ৩,০০০ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
নিখোঁজদের পরিবারের উদ্বেগ অবশ্য এখনও কাটেনি। সরকারি ভাবে উদ্ধার ও নিখোঁজদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ না হওয়ায় বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ। সঠিক তালিকা প্রকাশ এবং উদ্ধার তৎপরতা জোরদারের দাবিতে মাদ্রাজ হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলাও দায়ের হয়েছে।
সবমিলিয়ে নেপালের এই ভয়াবহ দুর্যোগ একদিকে যেমন হিমালয়ের বিপজ্জনক ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতকে সামনে এনেছে, তেমনই আন্তঃসীমান্ত আগাম সতর্কবার্তা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় তথ্য আদান-প্রদানের কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে ভয়াবহতার নতুন নতুন ছবি।
নতুন গতি 





























