হাসান লস্কর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা: সুন্দরবনের কুলতলিতে বাঘের আক্রমণে বহু মৎস্যজীবী ও বনজীবীদের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত এক সপ্তাহে বাঘের হানায় চারজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনে গত ২৫ বছরে (২০০১-২০২৫) বাঘের হামলায় ৪২৫ জন নিহত এবং ৯৫ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া সারা ভারতে গত পাঁচ বছরে ৪১৮ জন নিহত হওয়ার তথ্য মিলেছে চলতি বছরের মে ও জুন মাসে সুন্দরবন এবং এর সংলগ্ন এলাকাগুলিতে বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলি ও মৈপীঠ এলাকায় বাঘের আক্রমণে অন্তত ১০ জন মৎস্যজীবী ও মধু সংগ্রাহকের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে কেবল জুন মাসের প্রথমার্ধেই ১৮ দিনে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। অপরদিকে, বাঘের আক্রমণ থেকে সাহসিকতার সাথে লড়াই করে ও সঙ্গীদের তৎপরতায় অন্তত কয়েকজন মৎস্যজীবীর জীবিত ফিরে আসার খবরও সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক প্রাণহানির বেশ কয়েকটি ঘটনা জুন ১৭, ২০২৬ সুন্দরবনের পয়লাঘেরির বাসিন্দা কলস ক্যাম্পের ফুলবাড়ী জঙ্গলের কাছে নদীতে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে বন্দনা দাস (৩৭) নামে কুলতলির এক মহিলা মৎস্যজীবী মারা যান। জুন মাসের প্রথমার্ধ: কুলতলি ও মৈপীঠ অঞ্চলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে গোপাল চক্রবর্তী, গোষ্ঠবিহারী জানা, গোপাল নস্কর ও রামপ্রসাদ বাগানি সহ চারজন মৎস্যজীবী প্রাণ হারান। ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৬: পাথরপ্রতিমা ব্লকের কলস দ্বীপ সংলগ্ন এলাকায় কাঁকড়া ধরার সময় বাঘের হামলায় অপর এক মৎস্যজীবী প্রাণ হারান।
মে ও জুন মাসের বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণ বাঁচাতে সঙ্গীদের লড়াই ও বনকর্মীদের সহায়তায় বেশ কয়েকজন মৎস্যজীবীকে বাঘের মুখ থেকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ ও জঙ্গলমহলে সুরক্ষার দাবিতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাঘের আক্রমণে মৃত ও আহত মৎস্যজীবীদের এক পরিসংখ্যান বলছে সুন্দরবনের কুলতলিতে বাঘের আক্রমণে হতাহতের সংখ্যা নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী সরকারি পরিসংখ্যানে নেই। তবে মানবাধিকার সংস্থা APDR-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে কুলতলিসহ সুন্দরবন এলাকায় ১২টিরও বেশি বাঘ-মানুষের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। এর মধ্যে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৩ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে প্রায়শই স্থানীয় মানুষ গভীর জঙ্গলে ও নদী-খাঁড়িতে আক্রমণের শিকার হন। এর আগে, সুন্দরবন বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ প্রণেতা শিক্ষক শামসুদ্দিন শেখের তথ্য অনুসারে সুন্দরবনের বাঘ কি খাদ্যাভাবে ভুগছে? বিশেষজ্ঞদের মতে
সুন্দরবনের বাঘের মানুষ ধরার প্রবণতাও ক্রমশ বাড়ায় যা উদ্বেগের ও কারণ । সম্প্রতি দেউলবাড়ি এবং মৈপিট গ্রামের বেশ কয়েকজন জেলে বাউলে ভায়দের বাঘের আক্রমনে মারা যাওয়া আর দুজন আক্রান্ত হয়ে মরনাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন। এদিকে সেনসাস বলছে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে এবং পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বনাঞ্চলে লবণাম্বু’র সংসারের ঘনত্ব। সুন্দরবনের বাঘ মূলত কৌশলে শিকার ধরতে অভ্যস্ত দৌড়ে নয়। দীর্ঘ দিন জঙ্গলের গাছ কাটা না হওয়ার ফলে ঘনত্ব অত্যাধিক বাড়ায় জঙ্গল অভ্যন্তরে বর্তমানে খাল-সোতা-ভারানির চাপশা অর্থাৎ উদ্ভিদহীন বনতল এলাকা ছাড়া বাঘ শিকার করতে পারছে না। উত্তরে সূর্যমনি আর বিশ নং জঙ্গল থেকে মধ্যবর্তী দ্বীপগুলো এবং দক্ষিণে ডুলিভাসানিয়া, কলস-বিজিয়াড়া অর্থাৎ চুলকাটি বিভাগের জঙ্গলসমূহের প্রান্ত অর্থাৎ সৈকতে বর্তমানে হরিণ এবং শুকর তেমন আর চাক্ষুষ হয় না। কারণ হিসেবে ঋতুভিত্তিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং প্রলয়ঙ্কর গতির ঝড় এবং মেঘ ভাঙা বৃষ্টিতে আশ্রয়হীন বন্যদের প্রাণহানীর আশঙ্কা থেকেই যায় এবং ক্ষেত্রবিশেষে ঘটছেও। সমগ্র সুন্দরবনের আয়তন সাপেক্ষে বর্তমানে ১১০ টি বাঘের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের সংরক্ষিত বনাঞ্চলসমুহে যদি ধরা যায় শাবকসহ গোটা পনেরো বাঘ-বাঘিনী আছে। খাদ্যের প্রয়োজনে বাঘেরা সপ্তাহে যদি একটা হরিণ বা শুকর শিকার করে তাহলে ১৫ টির প্রয়োজন। হরিণ এবং শুকর মিলিয়ে মাসে ৬০ এবং বৎসরে ৭২০ টি প্রয়োজন হবে। প্রসবজনিত সমস্যা এবং দুর্যোগপূর্ণ বিরূপ আবহাওয়ার জন্য অনেক বন্য শিশু মারা যাওয়ার পরও কমপক্ষে ৭২০ টি শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি হলে সমতা বজায় থাকার কথা। এ তথ্য কিন্তু সমগ্র সুন্দরবনের ১১০ টি বাঘের উপরও প্রযোজ্য।
তরুণ গবেষক ‘বিবেক মিদ্দের কথা প্রসঙ্গে উঠে এল সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বর্তমানে বাঘদের ‘খাদ্য সংকট’। দেখা দিচ্ছে যার চরম পরিণতি বাঘের মানুষ ধরার প্রবণতা। চরম খাদ্য সংকটে থাকার কারণে নদীখালের প্রবেশ মুখে ক্ষুধার্ত বাঘেরা অপেক্ষায় থাকছে মাছ-কাঁকড়া ধরতে যাওয়া বোটের লক্ষ্যে । কাঁকড়া ধরতে বনভূমিতে পদার্পন কিংবা সরু খালে প্রবেশ করলেই ঘটছে চরম বিপদ। ফলস্বরূপ সম্প্রতি মাছ-কাঁকড়া সংগ্রহ করা ভাইদের উপর বার বার নেমে আসছে আক্রমণের খাঁড়া। এ প্রতিবেদন কেবল পরিস্থিতি বিবেচনায় একান্ত নিজস্ব পর্যবেক্ষণের উপর।বিশেষ করে মৈপীঠ ও অন্যান্য এলাকায় একাধিক মৎস্যজীবী ও বনকর্মী বাঘের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
নতুন গতি 






















