১০ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
১০ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩

প্রযুক্তি ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য ভুল সিদ্ধান্ত কমানো, তাহলে এত বিতর্ক কেন?

শান্তি রায়চৌধুরী: এবারের বিশ্বকাপ প্রযুক্তিতে ভরে আছে। তাই ধারণা করা হয়েছিল, এবার বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলা পরিচালনা নিয়ে কোন বিতর্ক বা সমালোচনা থাকবে না। কিন্তু কি হলো? প্রযুক্তির ব্যবহার এনেও এবারের বিশ্বকাপে আলোচনা আর বিতর্ক থামছে না।

অবশ্য প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন অনেক ভুল দূর করেছে, ঠিক তেমনি তা ফুটবলীয় আবেগ কমিয়ে এটিকে আরও যান্ত্রিক করে তুলছে। তাছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তির প্রয়োগে সমতা না আনতে পারায় তা সমালোচিত হচ্ছে। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর), সেমি-অটোমেটেড অফসাইড, ব্যাটারিচালিত ‘স্মার্ট বল’ এর মাধ্যমে ফিফার লক্ষ্য ছিল রেফারির ভুল কমিয়ে ফুটবলকে আরও দ্রুত ও নির্ভুল করা। ভিএআরকে আরও পাওয়ারফুল করা হয়েছে, কর্নার/ফ্রি-কিকের আগে ফাউল, ভুল হলুদ কার্ডও রিভিউর আওতায় আনা হয়। ফিফার রেফারিং প্রধান ইতালির পিয়েরলুইজি কলিনা বলেছেন, প্রযুক্তির লক্ষ্য মানবিক ভুল কমানো।

কিন্তু এত কিছু করেও বিতর্ক থামছে না। মাঠে, গ্যালারিতে, সামাজিক মাধ্যমে ভিএআর এখন সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত ইস্যু। এর প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা হওয়ার প্রধান কারণ, ভিডিও পর্যালোচনার ধীরগতি, খেলাধুলার স্বাভাবিক আনন্দ ও আবেগ নষ্ট হওয়া এবং খালি চোখে বোঝা যায় না, এমন অতি সূক্ষ্ম অফসাইডের কারণে গোল বাতিল। এছাড়াও বিভিন্ন ম্যাচে প্রযুক্তির অসঙ্গতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

বিতর্ক বেশি অফসাইড নির্ধারণে ব্যবহৃত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি নিয়ে। একজন খেলোয়াড়ের শরীরের কোনো অংশ (যেমন জুতোর অগ্রভাগ বা চুলের সামান্য ছোঁয়া) প্রতিপক্ষের চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকলে তাকে অফসাইড দেওয়া হচ্ছে। খেলার মাঠে এ ধরনের অতি সূক্ষ্ম অফসাইড কোনো প্রভাব না ফেললেও শুধু প্রযুক্তির সূক্ষ্মতার কারণে গোল বাতিল করা হচ্ছে। অনেক সময় প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সঠিক অ্যানিমেশন গ্রাফিকস দেখানো যায় না, যা দর্শকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে।

ভিএআর প্রযুক্তির কারণে মাঠের রেফারির নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব খর্ব হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। মাঠের রেফারিরা অনেক সময় স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভিএআর টিমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি একই ধরনের ঘটনায় কোনো ম্যাচে ভিএআর হস্তক্ষেপ করে পেনাল্টি বা গোল বাতিল করে, আবার অন্য কোনো ম্যাচে কোনো পদক্ষেপই নেয় না। এই অসংলগ্নতার কারণে রেফারির সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তির নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে ভিএআর-এর ভুল বা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সরাসরি ম্যাচের ফল বদলে দিচ্ছে। এই ধরনের ঘটনার শিকার হওয়া দলগুলোর খেলোয়াড় ও কোচেরা প্রায়ই হতাশা প্রকাশ করেন। কখনো কখনো তারা সরাসরি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন।

বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক লেগেই আছে।সর্বশেষ ‘রাউন্ড অব ১৬’তে আর্জেন্টিনা-মিশরের ম্যাচে প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল সমালোচনা হচ্ছে। মিশর যখন ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল, তখন মোস্তফা জিকো একটি দুর্দান্ত গোল করে দলকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। তবে গোলটির আক্রমণের সূচনালগ্নে মাঠের একদম অন্য প্রান্তে মিশরের মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেসের পায়ে হালকা আঘাত করেছিলেন। মাঠের রেফারি সেটিকে ফাউল না দিলেও অনেক পরে ভিএআর হস্তক্ষেপ করে গোলটি বাতিল করে দেয়। ধারাভাষ্যকার ও ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠের রেফারি ঘটনাটি দেখার পরও ভিএআর-এর সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর এমন ফাউল টেনে এনে গোল বাতিল করা প্রযুক্তির ক্ষমতার অপব্যবহার। এই সিদ্ধান্ত মিশরের ওপর বড় অন্যায় হিসেবে সমালোচিত হচ্ছে৷ মিশরের কোচ হোসাম হাসান সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং রেফারিং-এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

বিষয়টা হচ্ছে, সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যা হলো সেটি কখন এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভিএআর এসেছে রেফারির ভুল কমাতে। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে ভিএআর ব্যবহার হবে, রেফারি কীভাবে সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করবেন, আর একই ধরনের ঘটনায় কেন ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত হচ্ছে, এসব নিয়েই এখন বিতর্ক। ফিফা বলছে, প্রযুক্তি রেফারির সহায়ক। কিন্তু অনেক সমর্থকের মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারে এখনও যথেষ্ট ধারাবাহিকতা ও ন্যায্যতা আসেনি। প্রযুক্তি ফুটবলে সঠিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য এসেছে। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা হবে, কীভাবে তা ব্যাখ্যা করা হবে এবং খেলার স্বাভাবিক আবেগ কতটা অক্ষুণ্ন থাকবে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও পুরোপুরি মেলেনি। আসল সমস্যা প্রযুক্তি নয়, এর প্রয়োগে।

সর্বাধিক পাঠিত

বিশ্বকাপের ফাইনালে প্রথমবার হাফটাইম শো, মঞ্চ মাতাবেন যারা

নতুন গতি © All rights reserved.| Developed by eTech Builder

প্রযুক্তি ব্যবহারের মূল উদ্দেশ্য ভুল সিদ্ধান্ত কমানো, তাহলে এত বিতর্ক কেন?

আপডেট : ৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার

শান্তি রায়চৌধুরী: এবারের বিশ্বকাপ প্রযুক্তিতে ভরে আছে। তাই ধারণা করা হয়েছিল, এবার বিশ্বকাপ ফুটবলের খেলা পরিচালনা নিয়ে কোন বিতর্ক বা সমালোচনা থাকবে না। কিন্তু কি হলো? প্রযুক্তির ব্যবহার এনেও এবারের বিশ্বকাপে আলোচনা আর বিতর্ক থামছে না।

অবশ্য প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন অনেক ভুল দূর করেছে, ঠিক তেমনি তা ফুটবলীয় আবেগ কমিয়ে এটিকে আরও যান্ত্রিক করে তুলছে। তাছাড়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তির প্রয়োগে সমতা না আনতে পারায় তা সমালোচিত হচ্ছে। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর), সেমি-অটোমেটেড অফসাইড, ব্যাটারিচালিত ‘স্মার্ট বল’ এর মাধ্যমে ফিফার লক্ষ্য ছিল রেফারির ভুল কমিয়ে ফুটবলকে আরও দ্রুত ও নির্ভুল করা। ভিএআরকে আরও পাওয়ারফুল করা হয়েছে, কর্নার/ফ্রি-কিকের আগে ফাউল, ভুল হলুদ কার্ডও রিভিউর আওতায় আনা হয়। ফিফার রেফারিং প্রধান ইতালির পিয়েরলুইজি কলিনা বলেছেন, প্রযুক্তির লক্ষ্য মানবিক ভুল কমানো।

কিন্তু এত কিছু করেও বিতর্ক থামছে না। মাঠে, গ্যালারিতে, সামাজিক মাধ্যমে ভিএআর এখন সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত ইস্যু। এর প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনা হওয়ার প্রধান কারণ, ভিডিও পর্যালোচনার ধীরগতি, খেলাধুলার স্বাভাবিক আনন্দ ও আবেগ নষ্ট হওয়া এবং খালি চোখে বোঝা যায় না, এমন অতি সূক্ষ্ম অফসাইডের কারণে গোল বাতিল। এছাড়াও বিভিন্ন ম্যাচে প্রযুক্তির অসঙ্গতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

বিতর্ক বেশি অফসাইড নির্ধারণে ব্যবহৃত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি নিয়ে। একজন খেলোয়াড়ের শরীরের কোনো অংশ (যেমন জুতোর অগ্রভাগ বা চুলের সামান্য ছোঁয়া) প্রতিপক্ষের চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকলে তাকে অফসাইড দেওয়া হচ্ছে। খেলার মাঠে এ ধরনের অতি সূক্ষ্ম অফসাইড কোনো প্রভাব না ফেললেও শুধু প্রযুক্তির সূক্ষ্মতার কারণে গোল বাতিল করা হচ্ছে। অনেক সময় প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সঠিক অ্যানিমেশন গ্রাফিকস দেখানো যায় না, যা দর্শকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে।

ভিএআর প্রযুক্তির কারণে মাঠের রেফারির নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব খর্ব হয়েছে বলে অনেকেই মনে করেন। মাঠের রেফারিরা অনেক সময় স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভিএআর টিমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। পাশাপাশি একই ধরনের ঘটনায় কোনো ম্যাচে ভিএআর হস্তক্ষেপ করে পেনাল্টি বা গোল বাতিল করে, আবার অন্য কোনো ম্যাচে কোনো পদক্ষেপই নেয় না। এই অসংলগ্নতার কারণে রেফারির সিদ্ধান্ত ও প্রযুক্তির নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোতে ভিএআর-এর ভুল বা বিতর্কিত সিদ্ধান্ত সরাসরি ম্যাচের ফল বদলে দিচ্ছে। এই ধরনের ঘটনার শিকার হওয়া দলগুলোর খেলোয়াড় ও কোচেরা প্রায়ই হতাশা প্রকাশ করেন। কখনো কখনো তারা সরাসরি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলেন।

বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক লেগেই আছে।সর্বশেষ ‘রাউন্ড অব ১৬’তে আর্জেন্টিনা-মিশরের ম্যাচে প্রযুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমুল সমালোচনা হচ্ছে। মিশর যখন ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল, তখন মোস্তফা জিকো একটি দুর্দান্ত গোল করে দলকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নেন। তবে গোলটির আক্রমণের সূচনালগ্নে মাঠের একদম অন্য প্রান্তে মিশরের মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেসের পায়ে হালকা আঘাত করেছিলেন। মাঠের রেফারি সেটিকে ফাউল না দিলেও অনেক পরে ভিএআর হস্তক্ষেপ করে গোলটি বাতিল করে দেয়। ধারাভাষ্যকার ও ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠের রেফারি ঘটনাটি দেখার পরও ভিএআর-এর সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর এমন ফাউল টেনে এনে গোল বাতিল করা প্রযুক্তির ক্ষমতার অপব্যবহার। এই সিদ্ধান্ত মিশরের ওপর বড় অন্যায় হিসেবে সমালোচিত হচ্ছে৷ মিশরের কোচ হোসাম হাসান সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং রেফারিং-এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

বিষয়টা হচ্ছে, সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যা হলো সেটি কখন এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ভিএআর এসেছে রেফারির ভুল কমাতে। কিন্তু কোন পরিস্থিতিতে ভিএআর ব্যবহার হবে, রেফারি কীভাবে সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করবেন, আর একই ধরনের ঘটনায় কেন ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত হচ্ছে, এসব নিয়েই এখন বিতর্ক। ফিফা বলছে, প্রযুক্তি রেফারির সহায়ক। কিন্তু অনেক সমর্থকের মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারে এখনও যথেষ্ট ধারাবাহিকতা ও ন্যায্যতা আসেনি। প্রযুক্তি ফুটবলে সঠিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য এসেছে। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা হবে, কীভাবে তা ব্যাখ্যা করা হবে এবং খেলার স্বাভাবিক আবেগ কতটা অক্ষুণ্ন থাকবে, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও পুরোপুরি মেলেনি। আসল সমস্যা প্রযুক্তি নয়, এর প্রয়োগে।