২১ জুন ২০২৬, রবিবার, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩
২১ জুন ২০২৬, রবিবার, ৬ আষাঢ় ১৪৩৩

রাজমিস্ত্রীর সহকারী থিয়াগো এখন ব্রাজিল দলে, আলোড়ন উঠেছে বিশ্বকাপ জুড়ে!

শান্তি রায়চৌধুরী: বাস্তব জীবনটা মাঝে মাঝে রূপালী পর্দার গল্পকেও হার মানায়। আর তার সবচেয়ে বড় একটা উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তিনি হলেন ব্রাজিলের নতুন ফুটবল সেনসেশন ইগর থিয়াগো।

এক সময় এই ক্রিশ্চিয়ান থিয়াগো ব্রাসিলিয়ার ফুটপাথে মায়ের মুখে অন্ন জোগাতে রাজমিস্ত্রি বা বাজার বিক্রেতার কাজ করেছেন। সেই তেরো বছরের কিশোরই এখন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোর মাটিতে অনুষ্ঠেয় ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিখ্যাত ‘হলুদ-সবুজ’ জার্সিতে মাঠ কাঁপাতে তৈরি । কোচ কার্লো আনচেলত্তির বিশ্বজয়ের ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ফুটবল বিশ্বে এখন আলোচনার তুঙ্গে ব্রেন্টফোর্ডের এই গোলমেশিন।

ব্রাজিলের গামা শহরের এক হতদরিদ্র পরিবারে ছেলে ইগর। তার জীবনটা এই জায়গায় আসবে তা ছিল ভাবনার বাইরে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর মা মারিয়া দিভা এবং ভাই মাইকনের দায়িত্ব এসে পড়েছিল তাঁর ওপর। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন বুকে ধরে বেঁচে থাকার তাগিদে ইগর কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন, কখনো হাটে হাটে সবজি বিক্রি করেছেন, আবার কখনো ফুটপাতে গাড়ি ধুয়ারও কাজ করেছেন। কিন্তু এরপরও ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসাটা ছিল অটুট।

সিবিএফ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইগর আবেগঘন কণ্ঠে বলেছেন, “ছোটবেলার সেই কঠিন কাজগুলোই আজ আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে, জীবনের সাধারণ জিনিসগুলোর মূল্য দিতে শিখিয়েছে।”

সিবিএফ টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেছেন, “ছোটবেলায় আমি বাজারে কাজ করেছি, লিফলেট বিলি করেছি, গাড়ি ধুয়েছি এবং অনেক জমি পরিষ্কার করার কাজ করেছি। আর আমি রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবেও কাজ করেছি। আমি মনে করি সেই সব কাজই আজ আমাকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। আমার চরিত্র গঠন করতে সাহায্য করেছে। জীবনের সাধারণ জিনিসগুলোর মূল্য দিতে শিখিয়েছে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে কীভাবে উপভোগ করতে হয় তা শিখিয়েছে।”

ইগরকে এই জায়গায় নিয়ে আসার মানুষটি কিন্তু হলেন ব্রাজিলের বিখ্যাত প্রাক্তন ফুটবলার টিকো। শুরুতে অ্যাথলেটিকো পারানায়েন্সের ট্রায়ালে বাদ পড়লেও টিকোর পরামর্শে পারানার ছোট ক্লাব ‘ভেরে’-তে যোগ দেন তিনি। সেখানে অনূর্ধ্ব-১৭ টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে নজরে আসেন ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ক্রুজেইরোর। পেশাদার চুক্তি সই হলেও এক সময় বড় ক্লাবের আকাশচুম্বী চাপ কিশোর ইগরকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।

এ প্রসঙ্গে থিয়াগো বলেছেন, “ক্রুজেইরোতে থাকার সময়টা ছিল এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষের মতামত, সমালোচনা এবং প্রশংসা কীভাবে সামলাতে হয়, তা আমাকে অনেক বেশি শিখতে হয়েছিল।”

পরবর্তীতে ক্লাবের আর্থিক অনটনের কারণে মাত্র ৭৪ লক্ষ টাকায় রিয়ালে তাকে বুলগেরিয়ার ক্লাব লুদোগোরেতসের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বুলগেরিয়া থেকে বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুজ হয়ে ২০২৪ সালে প্রায় ২১ কোটিতে রিয়ালের রেকর্ড ট্রান্সফারে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রেন্টফোর্ডে যোগ দেন ইগর। আর ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখতেই এই স্ট্রাইকারের ভাগ্য খুলে যায়। এবারের প্রিমিয়ার লিগের চলতি মরসুমে ব্রেন্টফোর্ডের হয়ে ২২টি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আর্লিং হালান্ডের (২৬ গোল) ঠিক পেছনেই অবস্থান করছেন তিনি।

প্রিমিয়ার লিগে এই দলবদলই স্ট্রাইকার ইগরের ভাগ্য খুলে যায়। তাকে ব্রাজিল জাতীয় দলের রাডারে নিয়ে আসে। থিয়াগোর নজরকাড়া পারফরম্যান্স এড়াতে পারেননি ব্রাজিলের মাস্টারমাইন্ড কোচ কার্লো আনচেলত্তি। এরপরই তিনি বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে সেলেসাওদের মূল দলে ডাক পান। ইতোমধ্যে দেশের হয়ে দুটি ম্যাচ খেলে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটিও পেয়েছেন তিনি।

শৈশবের সেই ছেঁড়া বুট আর পেটের ক্ষুধা জয় করে ইগর থিয়াগো এখন ব্রাজিলের হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) মিশনের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং মাঠের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ী চরিত্রে পরিণত করেছে। একসময় পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে যিনি রাজমিস্ত্রির সহকারি, সবজি বিক্রেতা কিংবা গাড়ি ধোয়ার কাজ করেছেন, সেই কিশোরই আজ ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপে খেলছেন।

রেললাইনের পাশে পড়ে যুবক, আত্মহত্যার চেষ্টা নাকি দুর্ঘটনা? ধোঁয়াশায় বামনহাট

নতুন গতি © All rights reserved.| Developed by eTech Builder

রাজমিস্ত্রীর সহকারী থিয়াগো এখন ব্রাজিল দলে, আলোড়ন উঠেছে বিশ্বকাপ জুড়ে!

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, শুক্রবার

শান্তি রায়চৌধুরী: বাস্তব জীবনটা মাঝে মাঝে রূপালী পর্দার গল্পকেও হার মানায়। আর তার সবচেয়ে বড় একটা উদাহরণ আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তিনি হলেন ব্রাজিলের নতুন ফুটবল সেনসেশন ইগর থিয়াগো।

এক সময় এই ক্রিশ্চিয়ান থিয়াগো ব্রাসিলিয়ার ফুটপাথে মায়ের মুখে অন্ন জোগাতে রাজমিস্ত্রি বা বাজার বিক্রেতার কাজ করেছেন। সেই তেরো বছরের কিশোরই এখন যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা-মেক্সিকোর মাটিতে অনুষ্ঠেয় ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিখ্যাত ‘হলুদ-সবুজ’ জার্সিতে মাঠ কাঁপাতে তৈরি । কোচ কার্লো আনচেলত্তির বিশ্বজয়ের ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ফুটবল বিশ্বে এখন আলোচনার তুঙ্গে ব্রেন্টফোর্ডের এই গোলমেশিন।

ব্রাজিলের গামা শহরের এক হতদরিদ্র পরিবারে ছেলে ইগর। তার জীবনটা এই জায়গায় আসবে তা ছিল ভাবনার বাইরে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর মা মারিয়া দিভা এবং ভাই মাইকনের দায়িত্ব এসে পড়েছিল তাঁর ওপর। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন বুকে ধরে বেঁচে থাকার তাগিদে ইগর কখনো রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন, কখনো হাটে হাটে সবজি বিক্রি করেছেন, আবার কখনো ফুটপাতে গাড়ি ধুয়ারও কাজ করেছেন। কিন্তু এরপরও ফুটবলের প্রতি তাঁর ভালোবাসাটা ছিল অটুট।

সিবিএফ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইগর আবেগঘন কণ্ঠে বলেছেন, “ছোটবেলার সেই কঠিন কাজগুলোই আজ আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে, জীবনের সাধারণ জিনিসগুলোর মূল্য দিতে শিখিয়েছে।”

সিবিএফ টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেছেন, “ছোটবেলায় আমি বাজারে কাজ করেছি, লিফলেট বিলি করেছি, গাড়ি ধুয়েছি এবং অনেক জমি পরিষ্কার করার কাজ করেছি। আর আমি রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবেও কাজ করেছি। আমি মনে করি সেই সব কাজই আজ আমাকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। আমার চরিত্র গঠন করতে সাহায্য করেছে। জীবনের সাধারণ জিনিসগুলোর মূল্য দিতে শিখিয়েছে এবং প্রতিটি মুহূর্তকে কীভাবে উপভোগ করতে হয় তা শিখিয়েছে।”

ইগরকে এই জায়গায় নিয়ে আসার মানুষটি কিন্তু হলেন ব্রাজিলের বিখ্যাত প্রাক্তন ফুটবলার টিকো। শুরুতে অ্যাথলেটিকো পারানায়েন্সের ট্রায়ালে বাদ পড়লেও টিকোর পরামর্শে পারানার ছোট ক্লাব ‘ভেরে’-তে যোগ দেন তিনি। সেখানে অনূর্ধ্ব-১৭ টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে নজরে আসেন ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব ক্রুজেইরোর। পেশাদার চুক্তি সই হলেও এক সময় বড় ক্লাবের আকাশচুম্বী চাপ কিশোর ইগরকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল।

এ প্রসঙ্গে থিয়াগো বলেছেন, “ক্রুজেইরোতে থাকার সময়টা ছিল এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষের মতামত, সমালোচনা এবং প্রশংসা কীভাবে সামলাতে হয়, তা আমাকে অনেক বেশি শিখতে হয়েছিল।”

পরবর্তীতে ক্লাবের আর্থিক অনটনের কারণে মাত্র ৭৪ লক্ষ টাকায় রিয়ালে তাকে বুলগেরিয়ার ক্লাব লুদোগোরেতসের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বুলগেরিয়া থেকে বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুজ হয়ে ২০২৪ সালে প্রায় ২১ কোটিতে রিয়ালের রেকর্ড ট্রান্সফারে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রেন্টফোর্ডে যোগ দেন ইগর। আর ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখতেই এই স্ট্রাইকারের ভাগ্য খুলে যায়। এবারের প্রিমিয়ার লিগের চলতি মরসুমে ব্রেন্টফোর্ডের হয়ে ২২টি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আর্লিং হালান্ডের (২৬ গোল) ঠিক পেছনেই অবস্থান করছেন তিনি।

প্রিমিয়ার লিগে এই দলবদলই স্ট্রাইকার ইগরের ভাগ্য খুলে যায়। তাকে ব্রাজিল জাতীয় দলের রাডারে নিয়ে আসে। থিয়াগোর নজরকাড়া পারফরম্যান্স এড়াতে পারেননি ব্রাজিলের মাস্টারমাইন্ড কোচ কার্লো আনচেলত্তি। এরপরই তিনি বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে সেলেসাওদের মূল দলে ডাক পান। ইতোমধ্যে দেশের হয়ে দুটি ম্যাচ খেলে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক গোলটিও পেয়েছেন তিনি।

শৈশবের সেই ছেঁড়া বুট আর পেটের ক্ষুধা জয় করে ইগর থিয়াগো এখন ব্রাজিলের হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) মিশনের অন্যতম প্রধান কাণ্ডারি। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম এবং মাঠের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ী চরিত্রে পরিণত করেছে। একসময় পরিবারের মুখে অন্ন জোগাতে যিনি রাজমিস্ত্রির সহকারি, সবজি বিক্রেতা কিংবা গাড়ি ধোয়ার কাজ করেছেন, সেই কিশোরই আজ ব্রাজিল জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপে খেলছেন।